মার্কিন গাড়িতে কেন ইউরোপীয়দের অনাগ্রহ?

ইউরোপীয়রা কেন বেশি মার্কিন গাড়ি কেনেন না তা নিয়ে সম্প্রতি অসন্তুষ্টি জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ইউরোপীয়রা কেন বেশি মার্কিন গাড়ি কেনেন না তা নিয়ে সম্প্রতি অসন্তুষ্টি জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে আমদানি হওয়া গাড়ির ওপর বড় অংকে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। অবশ্য বিবিসির এক প্রতিবেদন অনুসারে, প্রয়োগিক কিছু কারণে মার্কিন গাড়ির প্রতি অনাগ্রহী ইউরোপীয়রা। এর সমাধানে মার্কিন কোম্পানিকেই এগিয়ে আসতে হবে।

সেখানে বলা হয়েছে, ইতালির পুরনো শহরগুলোর সংকীর্ণ ও পাথরে বাঁধানো সড়ক দেখলেই স্পষ্ট হবে কেন টেসলা ছাড়া অন্য মার্কিন গাড়ি ইউরোপে জনপ্রিয় হয়নি। গাড়ি শিল্পের বিশ্লেষক হ্যাম্পাস এঙ্গেলাউ বলেন, ‘ইতালিতে একটি বড় এসইউভি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন। আমি করেছি এবং এটা খুবই কঠিন।’

সড়ক অবকাঠামোর সঙ্গে ব্যয়ের বিষয়টি যোগ করলে ইউরোপীয়দের অনাগ্রহ আরো স্পষ্ট হবে। ইউরোপের সড়কে মার্কিন পিকআপ ট্রাক খুব একটা দেখা যায় না। এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের সোসাইটি অব মোটর ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ট্রেডার্সের (এসএমএমটি) প্রধান নির্বাহী মাইক হাওয়েস বলেন, ‘আমাদের জ্বালানির দাম সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি। তাই আমরা সাধারণত ছোট, জ্বালানি সাশ্রয়ী গাড়ি পছন্দ করি। আর তারা বড় গাড়ি পছন্দ করে।’

সুইডিশ বিনিয়োগ ব্যাংক হ্যান্ডেলসব্যাঙ্কেন ক্যাপিটাল মার্কেটের বিশ্লেষক এঙ্গেলাউ আরো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম ইউরোপের তুলনায় অনেক কম। তারা প্রতি গ্যালনে যা দেয়, আমরা প্রতি লিটারে সে দাম দিই।’ উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালনে ৩ লিটার ৮০০ মিলিলিটার জ্বালানি তেল থাকে।

অন্যদিকে ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতারা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের বড় অংশ দখল করতে সক্ষম হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষ্যে, আমাদের দেশে মিলিয়ন মিলিয়ন গাড়ি আসছে বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ, ফক্সওয়াগন ও আরো অনেক কিছু।

২০২২ সালে ইইউ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ৬ লাখ ৯২ হাজার ৩৩৪টি নতুন গাড়ি রফতানি করা হয়েছিল, যার মূল্য ছিল ৩ হাজার ৬০০ ইউরো বা ৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপে মাত্র ১ লাখ ১৬ হাজার ২০৭টি নতুন গাড়ি রফতানি করে, যার মূল্য ৫২০ কোটি ইউরো।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতে, অন্যায্য বাণিজ্য নিয়মের কারণে এ ভারসাম্যহীনতা এবং এটি সংশোধন করা প্রয়োজন। কারণ মার্কিন গাড়ির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে ইইউ, অন্যদিকে ইউরোপীয় গাড়ির ওপর যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ।

এ বৈষম্যের প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপীয় গাড়ি আমদানির ওপর আরো উচ্চ শুল্ক বসানোর পরিকল্পনা করছেন ট্রাম্প। এর আগে তিনি ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক বসিয়েছিলেন, যা গাড়ি নির্মাতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধাতু। ট্রাম্পের এ পদক্ষেপ ইউরোপকে শুল্ক কমানোর কথা ভাবতে বাধ্য করেছে।

অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, রফতানির ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়া ঠিক নয়। নিশান ও অ্যাসটন মার্টিনের সাবেক প্রধান নির্বাহী ও অটোমোবাইল খাতের পরামর্শক অ্যান্ডি পামার বলেন, ‘এক দেশ থেকে আরেক দেশে পাঠানোর চেয়ে সম্ভব হলে গাড়ি স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করাই ভালো। মার্কিন গাড়িগুলো বড় আকারের, ফলে পরিবহন ব্যয়ও বেশি।’

ইলোন মাস্কের টেসলা জার্মানির বার্লিনের কাছে একটি কারখানা স্থাপন করেছে। সেখানে ইউরোপীয় বাজারের জন্য মডেল ওয়াই গাড়ি তৈরি করা হচ্ছে। তবে চীনা কম দামি বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির প্রবেশ ইউরোপের ইভি বাজারে নতুন প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করেছে।

জেপি মরগানের ইউরোপীয় গাড়ি গবেষণা বিভাগের প্রধান হোসে আসুমেন্দি বলেন, ‘ইউরোপের গাড়ির বাজার খুবই প্রতিযোগিতামূলক। আপনার সঠিক পণ্য থাকতে হবে এবং কারখানাগুলো ভালোভাবে চালাতে হবে।’

তার মতে, স্থানীয় ব্র্যান্ড নিজ দেশে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পায়। যেমন জার্মানিতে বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ, ফক্সওয়াগন ও অডি জনপ্রিয়, ফ্রান্সে পিউজো, সিট্রোয়েন ও রেনোঁ এবং ইতালিতে ফিয়াট ও আলফা রোমিও। মানুষ সাধারণত নিজ দেশের জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের গাড়ি কিনতে আগ্রহী, বিশেষ করে জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালিতে।

আরও